স্ত্রী কর্তৃক তালাকের নোটিশ: সম্পূর্ণ প্রক্রিয়া, আইনগত ব্যাখ্যা ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র
বাংলাদেশে স্ত্রী কর্তৃক তালাকের নোটিশ পাঠানো একটি আইনি অধিকার, যা মুসলিম পরিবার আইন, ১৯৬১ অনুযায়ী সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। অনেকেই ভুল ধারণায় বিশ্বাস করে যে শুধু স্বামীই তালাক দিতে পারে—কিন্তু আইন বলছে স্ত্রীও নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে তালাক নোটিশ পাঠাতে পারবেন। এই ব্লগে আপনি তালাকের নোটিশের খসড়া, আইনগত ব্যাখ্যা, প্রক্রিয়া, প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ A-to-Z সবকিছু শিখে যাবেন।
স্ত্রী কর্তৃক তালাকের নোটিশ কী?
স্ত্রী কর্তৃক তালাকের নোটিশ হলো সেই আনুষ্ঠানিক লিখিত নোটিশ যা স্ত্রী তার স্বামীকে এবং স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ/সিটি কর্পোরেশনের চেয়ারম্যান/মেয়রকে পাঠান, যাতে তালাকের ইচ্ছা এবং তার কার্যকর হওয়ার প্রক্রিয়া উল্লেখ থাকে।
আইনগত ভিত্তি
Muslim Family Laws Ordinance, 1961 – Section 7
এই আইনের অধীনে স্ত্রী “তালাকের অধিকার (Talaq-e-tafwid)” কাবিননামায় পেলে সরাসরি তালাকের নোটিশ দিতে পারেন।
স্ত্রী খুলা চাইলে সেটি আলাদা প্রক্রিয়া।
গভীর ভুল–সংশোধন:
অনেকেই মনে করেন “স্ত্রী তালাক দিতে পারে না”—এটি আইনগতভাবে ভুল।
কে তালাকের নোটিশ দিতে পারেন?
স্ত্রী নিম্ন ক্ষেত্রে তালাকের নোটিশ দিতে পারেন—
১) কাবিননামায় “তালাক প্রদানের ক্ষমতা” দেওয়া থাকলে
(কলাম ১৮ সাধারণত)
২) স্বামী যদি তালাকের ক্ষমতা প্রতিনিধি হিসেবে স্ত্রীকে লিখিতভাবে অর্পণ করেন
(Tafwid)
৩) আদালতের মাধ্যমে (যদি স্ত্রী “বিচ্ছেদ” বা dissolutions claim করতে চান)
📌 Critical Insight:
কাবিননামা না পড়েই বিয়ে করা—এটাই ৮৫% দম্পতির প্রথম ভুল। তালাকের অধিকারের সীমা–বিস্তার আগে থেকেই ঠিক করে নেওয়া উচিত।
নোটিশ পাঠাতে যে নথিগুলো প্রয়োজন
স্ত্রী কর্তৃক তালাকের নোটিশ পাঠাতে সাধারণত নিচের নথিগুলো প্রয়োজন হয়—
- কাবিননামা (মূল/ছবি কপি)
- জাতীয় পরিচয়পত্র (NID)
- স্বামীর NID বা পরিচয়ের তথ্য
- বর্তমান ঠিকানার প্রমাণ
- বিবাহের প্রমাণ (মৌখিক হলেও সাক্ষী থাকে)
- প্রয়োজন হলে প্রমাণাদি (নির্যাতন, আর্থিক অবহেলা ইত্যাদি
স্বামী কর্তৃক নোটিশের উদাহরণ ও প্রসেস: https://ukilbd.com/swami-kortok-strike-legal-notice/
স্ত্রী কর্তৃক তালাকের নোটিশ পাঠানোর সম্পূর্ণ প্রক্রিয়া (Step-by-Step)

Step 1: তালাক নোটিশের খসড়া তৈরি করা
নোটিশে থাকতে হবে—
- স্ত্রী তালাক দিতে চান এমন ইচ্ছা
- স্বামীর পূর্ণ পরিচয়
- বিবাহের তারিখ
- তালাক কার্যকারিতা শুরু হওয়ার তারিখ
- কারণ (ঐচ্ছিক, কিন্তু উল্লেখ করা ভালো)
Step 2: স্থানীয় সালিশি কাউন্সিল/চেয়ারম্যান/মেয়রকে নোটিশ পাঠানো
আইন অনুযায়ী দুই জায়গায় পাঠানো বাধ্যতামূলক
- স্বামীকে
- চেয়ারম্যান/মেয়রকে
নোটিশ রেজিস্ট্রি ডাক বা কুরিয়ার দিয়ে পাঠানো উত্তম।
Step 3: ৯০ দিনের কাউন্টডাউন শুরু
নোটিশ জমা দেওয়ার তারিখ থেকে ৯০ দিন পর তালাক কার্যকর হয়।
Step 4: তালাক সনদ সংগ্রহ
৯০ দিন পর ইউনিয়ন পরিষদ/সিটি কর্পোরেশন তালাক রেজিস্টার করে সনদ দেয়।
সরকারি আইন ও বিধান দেখুন (Bangladesh Law Ministry):
https://lawjusticediv.gov.bd/
সালিশি কাউন্সিল কীভাবে কাজ করে
তালাকের নোটিশ পাঠানোর পর তিন মাস সালিশি প্রক্রিয়া চলে।
সালিশি কাউন্সিল গঠন
চেয়ারম্যান/মেয়র
স্বামী বা স্ত্রীর মনোনীত প্রতিনিধিরা
স্থানীয় সমাজ প্রতিনিধি
তারা কী করেন
পরিবারকে পুনর্মিলনের চেষ্টা
উভয় পক্ষের বক্তব্য শোনা
প্রয়োজনে পৃথক সাক্ষাৎকার নেওয়া
📌 Reality Check:
৯০% ক্ষেত্রে সালিশি কাউন্সিল কেবল আনুষ্ঠানিকতা পালন করে—বাস্তব সমাধান খুব কম হয়।
স্ত্রী তালাক দিলে আর্থিক অধিকারগুলো কী থাকে?
১. মোহরানা
স্বামীকে সম্পূর্ণ মোহরানা পরিশোধ করতে হবে
তালাক স্ত্রী শুরু করুক—বা স্বামী—আইনের চোখে মোহরানা বকেয়া থাকলে তা পরিশোধ বাধ্যতামূলক
২. ভরণপোষণ
তালাক কার্যকর হওয়া পর্যন্ত স্বামী ভরণপোষণ দিতে বাধ্য
সন্তান থাকলে সন্তানের ভরণপোষণ স্বামীকেই দিতে হবে
৩. দাম্পত্য সম্পত্তি
যদি স্ত্রী সংসারে অবদান রেখে থাকে (আয়, সম্পত্তি ক্রয়, যৌতুকের অর্থ ইত্যাদি), সেক্ষেত্রে নাগরিক আইনে তার দাবি করার সুযোগ থাকে।
ভুলভাবে তালাক নোটিশ পাঠালে কী সমস্যা হতে পারে?
নোটিশ invalid হয়ে যেতে পারে
যদি চেয়ারম্যান/মেয়রকে নোটিশ পাঠানো না হয় বা প্রক্রিয়াগত ভুল থাকে।
তালাক কার্যকর হবে না
৯০ দিনের টাইমলাইন ভুল হলে গণনা পুনরায় শুরু হবে।
আইনি ঝামেলা
স্বামী পাল্টা মামলা করতে পারে—যেমন অপপ্রচার বা প্রতারণার অভিযোগ।
Islamic Law বনাম Bangladesh Civil Law — কোথায় কী আলাদা?
| বিষয় | ইসলামিক বিধান | বাংলাদেশি আইন |
|---|---|---|
| তালাক দেওয়ার ক্ষমতা | মূলত স্বামীর | কাবিননামায় wife delegation হলে স্ত্রীও |
| সময়সীমা | ইদ্দত | আইনগত ৯০ দিন |
| তালাক নোটিশ | ধর্মীয়ভাবে বাধ্যতামূলক নয় | নোটিশ পাঠানো আবশ্যক |
| সালিশি | পরিবার-সমাজ | সরকারিভাবে কাউন্সিল |
বাংলাদেশে ধর্মীয় বিধান মানলেও রাষ্ট্রীয় আইন অমান্য করলে তালাক বৈধ হয় না।
কখন আইনজীবীর সহায়তা নেওয়া বাধ্যতামূলক?
- কাবিননামায় তালাকের অধিকার নেই
- স্বামী নোটিশ নিতে অস্বীকৃতি জানায়
- নির্যাতন বা হুমকি রয়েছে
- সন্তানের ভরণপোষণ দাবি করতে হবে
- সম্পত্তি/মোহরানা নিয়ে বিরোধ আছে
- স্বামী বিদেশে থাকেন
এসময় একজন অভিজ্ঞ ফ্যামিলি ল’ আইনজীবী নিয়োগ করা অপরিহার্য।
FAQ
স্ত্রী কর্তৃক তালাকের নোটিশ কী?
লিখিত নথি যা স্ত্রী স্বামী ও স্থানীয় কর্মকর্তাকে পাঠান, তালাকের ইচ্ছা জানানোর জন্য।
কে দিতে পারে?
কাবিননামায় অধিকার থাকা স্ত্রী বা আদালতের মাধ্যমে অনুমোদিত স্ত্রী।
প্রয়োজনীয় নথি?
কাবিননামা, NID, স্বামীর তথ্য, প্রয়োজন হলে প্রমাণাদি।
তালাক কার্যকর হওয়ার সময়?
নোটিশের ৯০ দিনের মধ্যে (ইদ্দত সময়) কার্যকর হয়।
ভুল নোটিশের সমস্যা?
নোটিশ invalid হতে পারে, তালাক কার্যকর হবে না, আদালতে বিরোধ হতে পারে।
উপসংহার
বাংলাদেশে স্ত্রী কর্তৃক তালাকের নোটিশ একটি বৈধ, স্বীকৃত ও সুস্পষ্ট আইনগত প্রক্রিয়া। আপনি যদি সঠিক নিয়মে নোটিশ পাঠান, ৯০ দিন শেষে তালাক স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকর হবে। ভুল প্রক্রিয়া এড়িয়ে চলতে চাইলে একজন অভিজ্ঞ আইনজীবীর সাহায্য নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ পথ।